অনুগল্প ২
।। প্রতিবাদ ।।
আষাঢ়ের বিকেলে গলদ ঘর্ম হয়ে উঠলাম ট্রেনে । আষাঢ়ের মাঝেও বৃষ্টির দেখা নেই , চাতক পাখির মতন দু ফোঁটা জলের জন্য রোজ বিকেলে হা পিত্যেস করে বসে থাকা । গুমোট গরমে প্রাণ ওষ্ঠাগত । এবারে কালবৈশাখীর দাপটও কম আবার তা হলেও নিদ্রাহীন রাত্রিযাপন , তার কেটে বিদ্যুৎহীন বন্দিদশা । কোনো কিছুতেই যেন শান্তি নেই । শান্তিনিকেতনের দৈনন্দিন জীবন এমন বিদ্যুৎ নির্ভর হয়ে উঠবে ভাবতেও পারিনি । সত্তর দশকের সেই দীর্ঘ বিদ্যুৎহীন সন্ধ্যেগুলো মনে করলে আলো আর পাখার অভাব আজও বোধ করি কিন্তু এখন ? জল গরম করতে বিদ্যুৎ , খাবার গরম করতে বিদ্যুৎ , ঘর ঠান্ডা করতে বিদ্যুৎ , বাড়ির ইন্টারনেট চালু রাখতে বিদ্যুৎ , সিসিটিভি চালু রাখতে বিদ্যুৎ ও সর্বোপরি বোকা বাক্সে সন্ধ্যের যুক্তি , তক্কো , গল্প শুনতেও সেই বিদ্যুৎ বাবুর উপস্থিতি জীবনের একমাত্র প্রয়োজন মনে হয় । ছোট্ট কাজে সকালে কলকাতা গিয়ে বিকেলে ফিরে আসার কারণেই ট্রেনে চাপা । রেক টা সারাদিন রোদে পরে থাকে বলে বোধ হয় এত গরম । সিট খালি থাকায় ট্রেন যে দিকে ছুটবে তার উল্টো দিকের জানালার ধারে উপবিষ্ট হলাম হাওয়া পাবার আশায় । ট্রেনের পাখাগুলো এখনও বন্ধ আর যখন চালু হলো তপ্ত ছাদের গরম হাওয়া মস্তকে প্রবাহিত হতে শুরু করলো । একটি মেয়ে পিঠে রুকস্যাক নিয়ে আমার সামনে এসে বসলো । ‘কাকু এই ট্রেন টা কতদূর যাবে ?’ বললাম ‘রামপুরহাট , তুমি কোথায় যাবে ?’ মেয়েটি বলল ‘ওই ঐদিকেই , আপনি ?’ বললাম ‘বোলপুর’ । মেয়েটি সিট টা কাপড় দিয়ে ঝেড়ে নিয়ে বসলো । ব্যাগ থেকে বোতল বার করে জল খেলো , রুমাল বার করে মুখ মুছে লম্বা একটা মোবাইল বার করলো ব্যাগ থেকে । বেশ পরিপাটি স্বভাবের মনে হলো । ট্রেন ছাড়লো , স্টেশন থেকে বাইরে আসতেই একটা ঠান্ডা বাতাসের ঝলকা এসে লাগলো মুখে । ট্রেন ছুটছে , আমি জানলা দিয়ে গলে আসা হাওয়ায় শরীরের ঘাম শুকোতে ব্যস্ত হয়ে পড়লাম । মেয়েটি ফোনে কথা বলে চলেছে । ব্যান্ডেলে ট্রেন থামতেই মেয়েটি ব্যাগটি পিঠে ঝুলিয়ে নেমে গেলো ভাবলাম এবার বোধহয় পা তুলে বসা যাবে । অসংখ্য হকারের চিৎকারে কান ঝালাপালা হঠাৎ দেখলাম মেয়েটি উঠে এসে আবার নিজের জায়গায় বসলো সঙ্গে একটি ছেলে । ছেলেটির পিঠেও রুকস্যাক , ট্রেন ছেড়ে দিলো । নীচু স্বরে দুজনে কথা বলেই চলেছে কার সাধ্য সেই কথা শোনার । কি করে যে ওরা পরস্পরের কথা শুনতে পাচ্ছে ভেবে আশ্চর্য্য হলাম । নির্ধারিত সময়েই ট্রেন পৌঁছালো বোলপুর স্টেশন , দাঁড়িয়ে উঠতেই মেয়েটি জিজ্ঞেস করলো ‘কাকু নেমে যাচ্ছেন ?’ বলেই মুখটা ঘুরিয়ে জানালার বাইরে তাকালো আমায় উত্তর দেবার সুযোগ দিলোনা ।
টোটো তে উঠেই বুঝলাম আকাশে বহু প্রত্যাশিত মেঘের জমায়েত । দক্ষিণ পশ্চিম কোনে থেকে থেকেই ফ্ল্যাশ লাইটের মতন আকাশের বুকে জ্বলে উঠছে আলো । বাড়ি পৌঁছতেই আমাদের বারান্দার টিনের চালে টপ টপ আওয়াজ তুলে শুরু হলো বৃষ্টি । ঝড়ের সেই রাত্রে যথারীতি ডাল ভেঙে বিচ্ছিন্ন হলো বিদ্যুৎ প্রবাহ , ক্লান্ত শরীর দক্ষিণের ঠান্ডা হাওয়ায় ভাসিয়ে দিয়ে ঘুমের অতলে তলিয়ে গেলাম । পরের দিন সকালে প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে আশ্রমের ভিতরে ভীড় দেখে এগিয়ে গেলাম । রামবহালদা আর সুব্রত চৌধুরী দার বেদির দিকে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছেনা । সিকিউরিটির লোকেরা ঘিরে আছে , পুলিশও হাজির । বুঝলাম কিছু একটা ঘটেছে । বিশ্বভারতীর সিকিউরিটি আধিকারিকের সাথে পরিচিতি থাকায় খানিক টা এগোতে পারলাম । সন্তোষালয়ের সামনে দুটি ছেলে মেয়ে গাছে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে । আত্মঘাতী হয়েছে তারা । গতকাল ট্রেনে আমার দুই সহযাত্রী কে চিনতে অসুবিধে হলোনা । শুধু অসুবিধে হলো বুঝতে কি করে এমন কঠিন সিদ্ধান্তে উপনীত হবার আগে এমন নির্লিপ্ত থাকা যায় । আধিকারিকের হাতে তাদের শেষ জবানবন্দি বোবা হয়ে তাকিয়ে রইলো ।
“ধর্মান্ধ সমাজের প্রতি আমাদের নীরব প্রতিবাদ । আমরা পালাইনি , আমরা এগিয়ে থাকলাম” ।
রত্না মন্ডল
শেখ ফারুক
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন