গল্প
‘কেটেছে একেলা বিরহের বেলা আকাশ কুসুম চয়নে………..’
মুম্বাইয়ের বান্দ্রা তে গীতা ট্রাভেলসের মালিক তাপস চ্যাটার্জির সুসজ্জিত ঘরে ইন্টারভিউ চলছে - ম্যানেজিং ডাইরেক্টরের একান্ত সচিব । স্বাভাবিকভাবেই মেয়েদেরই প্রাধান্য বেশি এবং প্রাথমিক বাছাই পর্বের পরে আজ তাপস বাবু নিজেই বেছে নেবেন তাঁর পছন্দের সচিব কে তাই মেয়েদেরই উপস্থিতি একশো শতাংশ । ব্যবসা টা বেশ বড় করে ফেলেছে তাপস মাসে প্রায় এক কোটি টাকার টার্ন ওভার । নিজের চেষ্টায় গত দশ বছরে এখানে পৌঁছেছে সে । অফিসের ওপরেই তার বিশাল প্রায় আড়াই তিন হাজার স্কোয়ার ফুটের ফ্ল্যাট । এই অফিস তার ক্লায়েন্ট এবং গুড উইলের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই তার একান্ত সচিব খুঁজে নিতে চাইছে । তাপস চোখ রাখছে সিসিটিভি ক্যামেরার মনিটরে সেখানেই একপ্রস্থ দেখে নেওয়া হচ্ছে উপস্থিত মেয়েদের মধ্যে কাকে তার বেশ ইম্প্রেসিভ মনে হচ্ছে । একটি মেয়ের প্রতি তার দৃষ্টি যাচ্ছে বার বার কিন্তু সিরিয়াল বজায় রাখতেই বোধহয় অন্য মেয়েরা প্রবেশ করছে আর মেয়েটি ধৈর্য্য ধরে অপেক্ষা কোরছে । মেয়েটি খুব রিজার্ভড এবং শান্ত এই দীর্ঘ অপেক্ষায় তার যেন কোনো হেলদোল নেই । অন্য কয়েকটি মেয়েকেও তাপসের বেশ ভালো লাগলো । অভিজ্ঞতা আছে , স্মার্ট , ভালো কথা বলতে পারে এবং তৎপর । অবশেষে তাপসের দৃষ্টি আকর্ষণকারী মেয়েটি ঘরে এলো ।
এক নজরেই মেয়েটি তাপসের আসক্তির কারণ হয়ে উঠলো । তাপস বললো ‘সিট ডাউন । নাম কি ?’ কুহেলি সরকার । ‘বাঙালি , কোথায় থাকো ?’ জিজ্ঞেস করলো তাপস । ‘ঘাট কোপার’ । ‘মালাড থেকে ওঠো না ঘাট কোপার ?’ আবার জিজ্ঞেস করলো তাপস । ‘মালাড’ কাছে হয়’ । কোথাও যেন তাপসের ইন্টারভিউয়ের থেকে কথোপকথন টাকে প্রাধান্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যেতে ইচ্ছে হলো । কুহেলি শ্যমবর্না , দীর্ঘাঙ্গী , চোখ দুটি ভীষণ আকর্ষক । সব মেয়েরা যখন ট্রাউজার , জিন্সে ভূষিতা কুহেলি একটি ছাপা শাড়িতে নিজেকে খুব সুন্দর করে উপস্থিত করেছে । দীর্ঘ দিন মহারাষ্ট্রে থেকে চাপা পরে যাওয়া বাঙালিয়ানা যেন তাপসের মনের মধ্যে ডুব দিয়ে উঠলো । ‘বাড়িতে কে আছেন ?’ তাপসের প্রশ্ন গুলো যেন কাজের থেকেও বেশী ব্যক্তিগত । ‘মা আর বাবা’ । ‘বাবা কি করেন ?’ ‘রিটায়ার্ড’ । ‘বোম্বেতে কত দিন আছো ?’ ‘এক বছর’ । ‘কোনো অভিজ্ঞতা ?’ ‘না , তবে পারবো’ । অন্য কারোর ক্ষেত্রে এই উত্তরের পর ইন্টারভিউয়ে কেউই আর বেশি সময় খরচ না করে পরের ক্যান্ডিডেট কে ডেকে নেবে কিন্তু তাপস যেন কোথাও কুহেলি কে নিয়ে আটকে গেছে , বললো ‘কোনো অসুবিধে নেই আমি দেখিয়ে দেব’ । হঠাৎ কুহেলি তাপসের দিকে তাকিয়ে যেন পীড়া পীড়ির ভঙ্গিতেই বলে উঠলো ‘জানি আমি উপযুক্ত নই কিন্তু কাজটা আমার খুব প্রয়োজন স্যার । আমার বাবা অসুস্থ কিছু করতে পারেন না মা খুব কষ্ট করে সংসার চালান । আমায় দয়া করবেন’ – তাপসের পছন্দের চোখ দুটো জলে ভরে উঠল । তাপসের মনে হলো তার বুকের ভিতরের শূন্যতা যেন কুহেলির চোখের জলে ভরে উঠল , তার মনের মৌন বীণা কার কোমল স্পর্শে বেজে উঠলো । ‘ চিন্তা কোরোনা আমি দেখবো , যা বলবো তাড়াতাড়ি শিখে নেবে । তোমার স্যালারি প্যাকেজ যা নির্দিষ্ট আছে তা তো পাবেই এ ছাড়া আমি আমার থেকে তোমায় একটা টাকা দেব । তোমার কোনো অসুবিধে হবেনা’ । বেশী দেরী হচ্ছে দেখে এইচ আর ম্যানেজার ইন্টারকমে তাপস কে ডেকে বললেন ‘আরও পাঁচ ছয় জন অপেক্ষা করছে , পাঠাবো স্যার ?’ ‘আই হ্যাভ মেড মাই সিলেকশন মিস্টার কাক্কার । ইউ মে গো আহেড উইথ দা রেস্ট’। মিস্টার কাক্কার ও আরও সকল কে আশ্চর্য্য করে কুহেলিকেই বেছে নিলো তাপস আর মনে মনে ভাবল যে মরুভূমিতে তুমি বারিধারার সঞ্চার করেছ সেখানে ফুল ফুটুক না ফুটুক তোমার মালির কাজ পাকা ।
কুহেলি কাজ এবং স্বভাবের দিক থেকে খুব আন্তরিক । তাপস যা বলে তৎপরতার সঙ্গে তা পালন করতে চেষ্টা করে । একদিন ট্রেন ফেল করে আসতে দেরী হওয়ায় তাপস নির্দেশ দিলো কুহেলির ট্রেনে আসার দরকার নেই তার গাড়ী গিয়ে নিয়ে আসবে কিন্তু অফিসে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই পৌঁছানো চাই । এই সিদ্ধান্তের মধ্যে শৃঙ্খলার চেয়েও বেশি ছিল তাপসের কুহেলির প্রতি দুর্বার আকর্ষণ , এক অদ্ভুত মায়ায় জড়িয়ে পড়ছে সে । এই নিয়ে অফিসের ভিতর কানাকানি , ফিসফিসানির শেষ নেই । কুহেলির অস্বস্তির কারণও হয়ে উঠছে কিন্তু তাপস নির্বিকার । তাপস বিপত্নীক ও নিঃসন্তান – পাঁচ বছরের বৈবাহিক জীবন পার হতেই সন্তানসম্ভবা রুমি হঠাৎই বাথরুমে পড়ে গিয়ে আঘাত পায় ও মিস ক্যারেজের সাথে সাথে বিভিন্ন শারীরিক জটিলতা তৈরী হয় আর দুই সপ্তাহ হাসপাতালে কাটিয়ে আকস্মিক মৃত্যুর শিকার হয় । একদিন তাপস কুহেলিকে তার ফ্ল্যাটে নিয়ে গেল সব ঘুরিয়ে দেখালো তারপর বিশাল ড্রইং রুমের কোনায় বার কাউন্টারে দাঁড়িয়ে নিজের জন্য ড্রিংক বানালো আর কুহেলিকে হালকা পানীয় পরিবেশন করলো । তার খুব ঘনিষ্ট হতে ইচ্ছে হয় কুহেলির সঙ্গে কিন্তু মনে হয় এমন ঘনিষ্ঠতা বোধ হয় কুহেলির মর্য্যাদা কে ক্ষুন্ন করবে , তাকে যথাযথ সম্মান দিয়ে নিয়ে আসতে হবে । তাপস বললো ‘আমি কিছুদিনের জন্য বাইরে যাবো । ব্যাংককে একটা কনফারেন্স আছে , তারপর সিঙ্গাপুর , হংকং হয়ে ফিরতে দিন সাতেক তো হবেই । আমি তোমায় কিছু টাকা দিয়ে যাচ্ছি তোমার দরকার হতেই পারে’ বলে সুদৃশ্য বার ক্যাবিনেটের পিছনে লুকোনো সেফ থেকে কয়েক বান্ডিল টাকা কুহেলির হাতে দিলো । কুহেলি মুখ নীচু করে বসে রইলো দু চোখ দিয়ে অশ্রুধারা গাল বেয়ে ঝরে পড়ছে টাকার বান্ডিল গুলোর উপর । তাপস ভীষণ আবেগপ্রবণ হয়ে কুহেলির হাতটা ধরে বলল ‘বিয়ে করবে আমায় ?’ কুহেলি কোনো উত্তর দিলোনা , বাকহীন নীরবতা তার সম্মতি হিসেবেই ধরে নিলো তাপস । তাপস বললো ‘আমি ফিরে এসেই তোমার বাবা মায়ের সাথে দেখা করবো ।
বহুদিন পরে তাপস যেন নিজেকে পাখির মতন হালকা অনুভব করছে । খুব সফল হলো কনফারেন্স , তাপসের কোম্পানির ব্যবসা যে আগামীতে আরও প্রসারিত হবে তার ইঙ্গিত মিলল । তার জীবনে যে শুভক্ষন উপস্থিত তা যেন তার হৃদয় দিয়ে অনুভব করতে পারে তাপস । সবই কুহেলির জন্য , তার আবির্ভাব তাপসের জীবনে পূর্নতা এনেছে । বাড়ি ফেরার এমন উদগ্র বাসনা সে বহুকালের মধ্যে অনুভব করেনি । ফিরে এসে শুনলো কুহেলি দুই দিন ধরে অফিসে আসছেনা ফোনও ধরেনা । তাপস একটু আশ্চর্য্য হলো । কুহেলি কি অসুস্থ ? তার ফোন কিন্তু এক বারেই ধরলো কুহেলি । ‘কেমন আছো কুহেলি ?’ ‘ভালো আছি’ । তাপস অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে ‘তাহলে অফিসে আসছ না কেন ?’ কুহেলির থেকে কোনো উত্তর মেলেনা , তাপসের হঠাৎ মনে হলো সে যাবার আগে বলেছিল ফিরে এসে কুহেলির বাবা মায়ের সঙ্গে দেখা করবে । নিশ্চয় কুহেলি লজ্জা পেয়ে বলছে না । হেসে উঠে তাপস বললো ‘ও বুঝেছি , আমি কাল সকালে তোমাদের বাড়ি আসছি’ । ‘হ্যাঁ আসুন’ । স্বাভাবিক ভাবে নরম স্বভাবের কুহেলির গলায় যেন এক দৃঢ়তার সুর এক প্রত্যয়ের আবির্ভাব । তাপস সুখ কল্পনায় এ হেন বাচনভঙ্গির হেরফেরে পাত্তা দিলোনা । রজনী অতিক্রান্ত হলেই তার ভবিষ্যৎ সুদৃঢ় হবে , এই বাড়ি কুহেলির আগমনে চঞ্চল হয়ে উঠবে । কুহেলি যথেষ্ট কাজ শিখেছে , গীতা ট্রাভেলসের দায়িত্ব কুহেলির হাতে দিয়ে সে এবার বিশ্রাম নেবে । পরের দিন সকালে যথারীতি সে পৌঁছে গেল কুহেলির বাড়িতে । বেল বাজাতেই দরজা খুলল কুহেলি । ‘আসুন । বাবা ভিতরে আছেন' । ছোট্ট বসার ঘরে গিয়ে বসল তাপস । ছোট হলেও ছিমছাম একটা রুচিবোধ আছে আর তা তো কুহেলিকে দেখেই সে বুঝে ছিল । কুহেলি ভিতরে গিয়ে হুইল চেয়ারে বসা তার বাবাকে নিয়ে এলো । তাপস উঠে দাঁড়ালো নমস্কার জানালো তারপর কুহেলির দিকে তাকিয়ে বলল ‘তুমি বলেছিলে বাবা অসুস্থ , আমায় বলোনি তো……’ ‘আপনি বসুন দাঁড়িয়ে রইলেন কেন ?’ কুহেলির বাবা বলে উঠলেন কুহেলি কোনো জবাব দেবার আগেই । ‘গত মাসে কুহু মা কিনে দিলো তার আগে তো বিছানা বন্দি ছিলাম । কেউ আমার সর্বস্ব শুধু কেড়ে নেয়নি আমার কোমড় টাও ভেঙে দিয়ে গেছে ।‘ তাপস উদগ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করলো ‘আপনার এই পরিণতির জন্য আপনি কাউকে রেস্পন্সিবল মনে করেন ?’ ‘অবশ্যই করি’ । ‘যদি আপনি ভগবান কে দায়ী করেন তো আমার বলার কিছু নেই কারণ সে তো অলীক কিন্তু কোনো ব্যক্তি হলে বলতে পারেন কুহেলির জন্য আমি সব করতে পারি’ । কথাটা বলে তাপস এক অব্যক্ত আবেগ বুকের মধ্যে বেঁধে রেখে তাকালো কুহেলির দিকে । একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তাপসের দিকে , এই দৃষ্টি সে কোনোদিন দেখেনি । তাপসের কেমন এক অজানা আশঙ্কায় আবেগ সরে গিয়ে বুকের ভিতর টা ধড়ফড় করে উঠলো । কুহেলির বাবা চেয়ারের পাশ থেকে একটি ফাইল বার কোরে টেবিলে রেখে হাত জোড় কোরে বললেন ‘দেখুন না তাপস বাবু এই ফাইলে আমার সর্বস্ব আছে কিন্তু আজ তা শুধুই কাগজ । আমার ছেলে ব্যবসা বাড়াবে বলে , বোনকে ভালো শিক্ষা দেবে বলে চিট ফান্ডে বহু টাকা ইনভেস্ট করেছিল । দশ বছর আগে রাতারাতি তা বন্ধ হয়ে যায় । ছেলে আমার গলায় দড়ি দিয়ে আত্মঘাতী হয় । আমি শুধু এই মেয়েটির জন্য কিছু করতে পারিনি । দেখুন না পারেন কিনা বীরভূমের ওই এজেন্ট সন্দীপ সেন কে খুঁজে দিতে । গত দশ বছর তাকে হন্যে হয়ে খুঁজছি’ । চেয়ার থেকে উঠে পড়ল তাপস , ফাইল টা হাতে নিয়ে বললো ‘আজ চলি এইটা রইলো আমার কাছে’ । তাপস গাড়িতে গিয়ে বসল , কুহেলি এসে দাঁড়ালো দরজার কাছে । তাপস একবার কুহেলির দিকে তাকিয়ে ড্রাইভার কে বলল ‘চলো’ । অফিসে নিজের চেম্বারে এসে বসলো , বাইরে ডোন্ট ডিস্টার্ব লাইট টা জ্বালিয়ে দিয়ে ফাইল টা খুলল । ওপরেই একটা পেপার কাটিং – খবরের কাগজে এক টুকরো খবর হয়ে বাবার হৃদয়ে অবিচল হয়ে আছে । “আত্মঘাতী গৌতম সরকার” ছবিসহ । চিনতে অসুবিধে হলোনা তাপসের । চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে রইল কখন যে দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যে হলো জানতেও পারলো না । সন্ধ্যে বেলা কুহেলি এলো অফিসে । মনিটরে দেখেই ইন্টারকমে রিসেপসনিস্ট কে বলল কুহেলি কে ভিতরে পাঠিয়ে দিতে । কুহেলি এসে বসলো সামনের চেয়ারে , তার মধ্যে অপরিচিত একটা প্রত্যয়ের ভাব । সেই নরম , কোমল ভাবখানা যেন রাতারাতি উবে গেছে । ‘আমি জানতাম আপনি কোনো প্রমাণ ছাড়বেন না শুধু আপনার ঘরের পুরোনো ফাইল থেকে ভাসি মুম্বাইয়ের কসমেটিক সার্জারি ক্লিনিকের ঠিকানা পেয়ে ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আমার এই সন্দেহ বিশ্বাসে পরিণত হয়েছে আমি…….’ কুহেলির মুখের কথাটা কেড়ে নিয়ে তাপস বললো ‘তুমি মিস কাকলি সরকার আমাকে এক্সপোজ করবে , তাই তো ? পারবে ? হ্যাঁ আমিই সেই সন্দীপ সেন আজকের তাপস চ্যাটার্জি । কসমেটিক ক্লিনিকের কাগজ দেখিয়ে প্রমান করে দেবে ?’ ‘না পারবো না জানি । আপনার অর্থ , ক্ষমতা দিয়ে সব সাজিয়ে নিয়েছেন , কসমেটিক সার্জারি কোরে নিজেকে খানিকটা বদলেও ফেলেছেন । সন্দীপ সেন মারা গেছেন আর তাপস চ্যাটার্জি জন্মগ্রহণ করেছে , আজকের দিনে কাগজ তাই বলে কিন্তু এত বড় সত্যটা আপনি সারা জীবন ঢেকে রাখতে পারবেন ? ’ চোখ তুলে তাপসের দিকে তাকালো কুহেলি সেই বেদনা আর মায়ায় ভরা দৃষ্টি আবার ফিরে এসেছে । বিশাল কাঁচের জানলার কাছে দাঁড়িয়ে তাপস বললো ‘সত্য মিথ্যে বলে কিছু হয়না মিস সরকার । রাত যেমন সত্য দিনও তাই । যে রাতে জন্মায় আর রাতেই মারা যায় তার কাছে দিন বলে কিছু হয়না , সবই পারস্পেক্টিভের খেলা । পৃথিবীটা শুধু সাদা আর কালো দিয়েই দেখা যায়না এখানে আরও অনেক রং আছে । যাইহোক কি চাও বলো ? তুমি যা চেয়েছো তার বেশিই দিয়েছি’ । ‘জানি অনেক করেছেন আমার জন্য । আমার দাদা কে তো আর ফিরিয়ে দিতে পারবেন না অন্ততঃ গরিব মানুষগুলোর টাকা ফিরিয়ে দিন প্লিজ’ । আকুতির স্বরে বলে উঠলো কুহেলি । ‘আর তার বিনিময়ে তুমি আমায় কি দেবে মিস সরকার ? বার বার তো শুধু পাওয়া যায়না কখনো দিতেও হয়’ । কিছুটা বিদ্রুপের ছলেই বলে উঠলো তাপস । কুহেলি সারির আঁচলটা টেনে নিয়ে বললো ‘আমি আপনাকে বিয়ে করতে রাজি আছি । আমি বাবা , মা কাউকে কিচ্ছু বলিনি’ । ‘দয়া ? অনুকম্পা ? আত্মত্যাগ ?’ হেসে উঠলো তাপস তারপর বজ্র কঠিন গলায় বলল ‘প্লিজ লিভ , আমায় একা থাকতে দাও’ ।
ঠিক আটচল্লিশ ঘন্টা পরে কুহেলির ফোনে তাপসের নম্বর ভেসে উঠলো । ‘ কাল সকাল ঠিক এগারোটার সময় আমার সঙ্গে দেখা করো’ এইটুকু বলেই ছেড়ে দিলো তাপস । অফিসে যেতেই কুহেলির কাছে নির্দেশ এলো উপরে ফ্ল্যাটে আসতে । বসার ঘরে বেশ কয়েকজন উকিল ও অন্যান্য লোকজন । তাপস ইশারা করে বললো ভিতরে আসতে , শোবার ঘরের লাগোয়া ব্যালকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো দুজন । দূরে যেখানে নীল আরব সাগর আর নীল আকাশ মিশে গেছে সেইদিকে তাকিয়ে রইলো তাপস , কুহেলি একদৃষ্টে তাপসের দিকে তাকিয়ে । দুজনের দৃষ্টি পৃথক – একজন অনন্ত পারাবারের সন্ধানে আর একজন সেই ব্যক্তিটির দিকে যে একদিকে অপরাধী অন্যদিকে কবে যেন ভালোবেসে ফেলা পাত্রটি , তারপর সব কেমন গোলমাল হয়ে গেল । তাপস ঘুরে দাঁড়িয়ে সরাসরি কুহেলির দিকে তাকিয়ে বলল ‘আমার জীবনের কোন গল্প বলার জন্য তোমায় ডাকিনি , না আমার আত্মপক্ষ সমর্থন করার কোনো চেষ্টা । আমার গল্প অব্যক্তই থাক । ঠিকই বলেছ এরপর এই গ্লানি নিয়ে , তোমার কাছে এত ছোট হয়ে বেঁচে থাকার মধ্যে কোনো সন্মান নেই , কোনো চ্যালেঞ্জ নেই । তাই শক্ত পথ টাই বেছে নিলাম । ধন্যবাদ তোমাকে আমার মধ্যে আস্পৃহার এই অনির্বান শিখাটি প্রজ্বলিত করার জন্য । তুমি মুক্ত , তোমার জীবন তুমি বেছে নাও শুধু অনুরোধ আমার অসম্পূর্ন কাজগুলো তুমি সম্পূর্ন কোরো । এডভোকেট জোশি তোমায় সব বুঝিয়ে দেবেন’ । কুহেলি কে ঘরে নিয়ে গিয়ে জোশির সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিল । ‘মিস্টার জোশি শি ইজ কুহেলি সরকার – নাও রিপোর্ট টু হার এন্ড এক্সপ্লেন হোয়াটেভার ইউ নিড টু’ । কুহেলি বিহ্বল হয়ে তাকালো তাপসের দিকে – তাপস প্রবেশ পথের দিকে নির্দেশ করে কুহেলি সহ সবাইকে বিদায় নিতে বললো । অফিসে বসে জোশি যা বললেন তার সারাংশ হলো কুহেলি আজ থেকে তাপসের ব্যবসা , স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি ও যেখানে যা ক্যাশ টাকা আছে সব কিছুর একশো শতাংশ মালিক । তার খুশি মতন সে সব সিদ্ধান্ত নিতে পারে । কুহেলি কিছুক্ষণ মাথায় হাত দিয়ে বসে রইল । তাপসের ফোন সুইচ অফ , দেখা করতে চাইল বেয়াড়া বললো তাপস কারোর সঙ্গে দেখা করবেনা বলে দিয়েছে । রাত্রে বহুবার চেষ্টা করলো ফোনে সেই একই কথা ‘সুইচড অফ’ । পরের দিন সকালে খবর পেলো তাপস বান্দ্রা থানায় আত্মসমর্পণ করতে যাচ্ছে । কুহেলি ছুটলো সেখানে কিন্তু মিস্টার জোশি থানার বাইরে বেরিয়ে এসে বললেন তাপস না করে দিয়েছে । কুহেলির ধৈর্য্যের বাঁধ ভেঙে গেল চিৎকার করে থানার বড় বাবুকে ডাকলো । অপরিচিত মহিলার চিৎকার শুনে এক অফিসার বেড়িয়ে এলেন কুহেলি বললো সে বড় বাবুর সঙ্গে দেখা করতে চায় । বড় বাবুর টেবিলে যেতেই বাবু কুহেলির দিকে তাকালেন ‘ইয়েস ম্যাম ?’ ‘তাপস চ্যাটার্জি’ , বড়বাবু বললেন ‘আপ’ ? কুহেলি নির্দ্বিধায় , নিঃসংকোচে বলে দিল ‘উনকি পত্নী’ । ‘ওহ ম্যাম শিওর প্লিজ কাম’ । বড় বাবুর ঘরের পাশে ছোট্টো একটা ঘরে তাপস বসেছিল । কুহেলি গিয়ে দাঁড়ালো তার সামনে । ‘তোমার সব দায় দায়িত্ব আমার উপর চাপিয়ে দিয়ে তুমি কি প্রমান করতে চাইছো ? তুমি মহান ? কাল থেকে আমায় দেখা করতে দিচ্ছনা একি তোমার আমার প্রতি ঘৃণা না তোমার অহংকার ?’ তাপস দাঁড়িয়ে উঠে বললো ‘ভগবানের পরে যদি আমি কাউকে শ্রদ্ধা করি সে তুমি কুহেলি । তোমায় ঘৃণা ?’ ‘তাহলে আমায় এড়িয়ে যাচ্ছো কেন?’ ‘তোমায় দেখে যদি আবার হারিয়ে যাই , আবার যদি এই বাহ্য জগৎ আমায় আকর্ষণ করে কুহেলি’ । ‘আমার সঙ্গে আলোচনা না করে এত বড় দায়িত্ব আমায় দিলে কি করে ? কে দিলো তোমায় এই অধিকার ?’ ‘ আমার আর কোনো উপায় ছিলোনা কুহেলি , তোমার সহযোগিতা ছাড়া এই শুদ্ধিকরণ আমার পক্ষে অসম্ভব’ । ‘এই দায়িত্ব গ্রহণের আগে আমার যে কিছু জানার ছিল ?’ ‘বলো’ তাপস তাকিয়ে রইলো কুহেলির দিকে । ‘এ সবই তো তোমার জন্যে । তোমার বড়ত্ব , তোমার শুদ্ধিকরণ , তোমার অহংকার , তোমার অসম্পূর্ন কাজ কিন্তু আমার জন্যে কিছুই ভাবলেনা’ । তাপস এগিয়ে এসে আবার কুহেলির মাথায় হাত রাখলো ‘সবই তো তোমার কুহেলি ?’ ‘কিছুই আমার নয় আমি তোমার বিষয় সম্পত্তির তত্ত্বাবধায়ক , ফিরে এসে তুমি সবই আবার ফিরে পাবে’ । কুহেলির গলায় সেই প্রত্যয় । ‘কখনোই না , এইসব আমি কিছুই চাইনা । যার যা পাওনা আছে মিটিয়ে দাও বাকি সব তোমার’ দৃঢ়তার সঙ্গে বললো তাপস । ‘এত গূঢ় দায়িত্ব দিচ্ছ যাকে তাকে গ্রহণ করতে তোমার এত কুণ্ঠা এত অহংকার ?’ কুহেলির চোখ দুটি জলে ভরে উঠল । তাপস কুহেলির গাল দুটো ধরে বললো ‘তোমায় গ্রহণ করার জায়গা কোথায় ? তোমার আর আমার পৃথিবী যে আলাদা হয়ে গেছে কুহেলি , অনেক ব্যবধান । তুমি আলোর জগতে আর আমি প্রবেশ করবো অন্ধকারে । তবে যদি সম্ভব হয় আর সত্যিই ভালোবাসো তবে আমায় আলোয় ফেরার সময়টুকু দিও’ । কুহেলি তাপস কে জড়িয়ে ধরলো কাঁদতে কাঁদতে অস্ফুট স্বরে বললো ‘তাড়াতাড়ি চলে এসো’ ।
তাপসের ফ্ল্যাট টা রেখে বাকি স্থাবর , অস্থাবর সব সম্পত্তি , ব্যবসা বিক্রি করে দিলো কুহেলি । অনেক টাকা পাওয়া গেলো তার গোপন ভল্ট থেকে আর সব দিয়ে জীবিত গ্রামবাসী দের পাওনা টাকা মিটিয়ে দিলো সুদ সমেত । যা রইলো তাই দিয়ে একটা ছোট্ট এনজিও খুলল বান্দ্রাতেই , নাম দিলো গীতা ফাউন্ডেশন । তাপসের মায়ের নাম । কুহেলি ঘাট কোপারের বাড়িতেই থাকে , রোজ দিনের বেলায় ফ্ল্যাটে এসে দেখাশোনা করে বাকি সময়টা এনজিও তে কাটায় । সন্ধ্যেবেলা আরব সাগরের তীরে দাঁড়িয়ে সূর্য্যাস্তের নরম আলোয় ভেসে ওঠা ঢেউয়ের সাথে নিজেকে ভাসিয়ে রাখে আগামীর অপেক্ষায় আর তাপসের প্রতিক্ষায় ।
……………সমাপ্ত………….
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন