অনুগল্প
টেগ বাহাদুর )
তখন আমার আস্তানা জঙ্গলের ভিতর নদীর ধারের বাংলো । এক সন্ধ্যেবেলা বারান্দায় বসে আছি । সামনে কুয়াশার চাদরে মোড়া অমাবস্যার জঙ্গল । কানে আসছে নদীর জলের আওয়াজ , পাথরে ধাক্কা খেয়ে স্রোতের অগ্রগতির ধারাবাহিক ছল্ ছল্ শব্দ । আকাশও এবার অন্ধকার হয়ে এলো , জোনাকির আলো যেন আরও স্পষ্ট হচ্ছে । ঠান্ডায় গরম চাদরটা আর একটু জড়িয়ে নিয়ে সিগারেটের বাক্স থেকে একটা সিগারেট বার করলাম । ধোঁয়ায় বুকটা ভরিয়ে নিয়ে সামনে রাখা লণ্ঠনের আলোয় নির্গত ধোঁয়ার ঘনত্ব টা আন্দাজ করে নিলাম । ধোঁয়া দেখতে না পেলে আমার নেশা তেমন জমে না । টেগবাহাদুর , এখানকার কেয়ারটেকার - গেছে বাজার করতে । রাতে মুরগির ঝোল আর ভাত রাঁধবে । বিভিন্ন পাখী আর পোকার ডাকে জঙ্গল যখন ক্রমশঃ জেগে উঠছে , হালকা হাওয়ায় শালের বনের মর্মর ধ্বনি বাংলোর চারপাশে যখন এক অদ্ভুত পরিবেশ রচনা করছে মনে হলো এক কাপ চা পেলে মন্দ হয়না কিন্তু বাহাদুর আসেনি । প্রকৃতির এই নিকষ কালো অবগুণ্ঠনের আড়ালে মনে হয় এক অচেনা সময় যেন চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে । নিস্তব্ধতা ভঙ্গ করে গেটের কাছে টক করে আওয়াজ হলো । বললাম ‘বাহাদুর ?’ হালকা উত্তর এলো ‘সাহাব’ – নিশ্চিন্ত হলাম । আহারের প্রবৃত্তিটা বাড়ানোর তাগিদে ভাবলাম সামনে একটু হেঁটে আসি । কাঠের সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতেই মাথার উপর দিয়ে একটা বাদুড় উড়ে গেল আর বাংলোর চালে সশব্দে ডেকে উঠলো তক্ষক । অদ্ভুত ভাবে ডাকে ওরা – প্রথমে গর গর করে ওঠে তারপর তক্কে তক্কে করে বারো বার , চোদ্দ বার ডাকে । এরা বলে যার যত বয়েস ওরা নাকি তত বার ডাকে । সামনের পাথরের রাস্তায় পায়ে পায়ে এগিয়ে গেটের কাছে এসে দাঁড়ালাম , সামনে চাপ চাপ অন্ধকার । ঘুরে দাঁড়িয়ে দেখি বাংলোর বারান্দা টা অন্ধকার , লণ্ঠন টা কি নিবে গেল ? ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগোচ্ছি মনে মনে বিরক্ত হচ্ছি টর্চ টা ঘরে পড়ে আছে ভেবে হঠাৎ পিছনে গেটের বাইরে থেকে বাহাদুরের গলা ‘সাহাব ইধার আইয়ে’ । দেখলাম হ্যারিকেন নিয়ে কেউ দাঁড়িয়ে । ভাবলাম বাহাদুর বেরোলো কখন কিন্তু আলোর টানে গেটের দিকে এগিয়ে গেলাম । গেটের কাছে আসতেই মনে হলো আলো টা আর একটু দূরে সরে গেছে । বললাম ‘কেয়া হ্যায় বাহাদুর ?’ ‘সাহাব আপ বাহার আইয়ে না’ । গেট খুলে বেরোলাম লণ্ঠনের আলো যেন আর একটু পিছিয়ে গেল , ‘বাহাদুর কাঁহা যা রাহে হো ?’ ‘আপ আইয়ে না’ । ঘন কালো অন্ধকারের বুকে এই এক ফোঁটা আলো যেন আমায় দুর্নিবার আকর্ষণে টেনে নিয়ে চললো । আলোর সঙ্গে আমার দূরত্বও ঘোচেনা , চলাও থামেনা । নিজেকে সংযত করে দাঁড়িয়ে পড়লাম । আলো টা থমকে গেল এক নির্দিষ্ট দূরত্বে আর আমার কানের কাছে বাহাদুর কেমন একটা কর্কষ স্বরে বলে উঠলো ‘ডরনা মত সাহাব , ম্যায় হুঁ না’ , একটা হিমশীতল হাত আমার কনুই টা চেপে ধরলো । আমি সজোরে হাত টা ছাড়িয়ে ঘুরতে গেলাম আছড়ে পড়লাম মাটিতে আর কিচ্ছু জানিনা । যখন চেতনা ফিরল দেখলাম একটি ঘরে আমি শুয়ে , এক খাকি জামা পরা অল্প বয়সী এগিয়ে এলেন । পরিচয় দিলেন ‘আমি এই ফরেস্টের বিট অফিসার আপনাকে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে উঠিয়ে আনলাম । আপনার গোঙানোর আওয়াজ বহু দূর থেকে শোনা যাচ্ছিল’ । ‘আপনি কোথায় আছেন
?’ বললাম ‘ফরেস্ট বাংলো’ । ‘কিন্তু বাংলো থেকে দুই আড়াই কিলোমিটার দূরে এই অন্ধকারে আসলেন কি করে ?’ ভদ্রলোক এক নাগাড়ে বলে যাচ্ছেন ‘তাহলে তো আপনার খাওয়া দাওয়ার খুব অসুবিধে হচ্ছে , আমাদের কেয়ারটেকার টেগবাহাদুর গতকাল বিকেলেই বড় রাস্তা পার হতে গিয়ে গাড়ি চাপা পরে মারা গেছে’ ।
সম্বিত সিনহা
গুরুপল্লী , শান্তিনিকেতন
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন