Essay

 

রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন

 

 

কি করি , শান্তিনিকেতন নিয়ে ভাবনা যে থামে না যে মাটির রূপ , রস , গন্ধ নিয়ে এই বড় হয়ে ওঠা , যার ধরণীর কোনে এক টুকরো বাসা , যার হাওয়ায় মিশে আছে ছেলেবেলার স্বপ্ন , বড় বেলার বাস্তব আর ভবিষ্যতের অঙ্গীকার তার কথা  অবচেতন মনে আচঁর কেটেই যায়   আমার মতামত নয় আমার ভাবনা যা কোনো ইচ্ছা প্রসূত নয় শুধু এই মাটির প্রতি ভালোবাসা  যা মর্মে দোলা দেয় , অন্তরে বিদ্ধ হয়ে থাকে শরতের নিরিবিলি মেঘাচ্ছন্ন সকালে মন উড়লো এক অন্য ভাবনা নিয়ে আজ বিশ্বভারতী তথা শান্তিনিকেতন এক চরম সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে এই সংকট কি এড়ানো যেত ? তাহলে ভাবতে হয় সমস্যার জড় কোথায় , কি সেই নিহিত কারণ ঝগড়া দোষারোপ কোনো সমাধান নয় ভাবনাও কোনো সমাধান নয় তবে সমস্যার সূচনার খেই পেলে সমাধান সূত্র বের হওয়ার একটা সুযোগ থাকে ইতিহাস একজন নিরপেক্ষ সাক্ষী হিসেবে যা বুঝি তা হলো এখানে মূল বিরোধ হচ্ছে এই মহান প্রতিষ্ঠানের স্রষ্টার ভাবনা , স্বপ্ন আর তার রক্ষকদের আজকের সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে সেই ভাবনা আর স্বপ্ন কে বাস্তবায়িত করা এবং রক্ষা করার ইচ্ছা বহু ক্ষেত্রে অপারগতা ইচ্ছা থাকলে উপায় হয় তো চলতি কথা কিন্তু সময়ের স্রোতে বিপরীতে হেঁটে সব উপায় বের করা সম্ভবপর কি ? সময়ের সঙ্গে চলার যে গুরু দায়িত্ব তাকেই বা উপেক্ষা করার উপায় কি  স্বাধীনতা পরবর্তী যে হানিমুন পিরিয়ড তাতে ভারতবর্ষ মজে ছিল এক রোমান্টিকতার মধ্যে বিশ্বভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের কর্মকান্ড এই নতুন ভারতের নতুন নির্বাচিত কেন্দ্রের  অধিক স্নেহের প্রাবল্যে বোধহয় কিঞ্চিৎ ভেসে গেছিলো আমার ভাবনা কারণ তখন আমি ছিলাম না তবে ইতিহাস ঘেঁটে যা বুঝি তারই উপলব্ধি মূল কথা আমার    মতে গোলমাল টির শুরু সম্ভবতঃ ওই কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় হওয়ার গোড়ার থেকেই

 

  গুরুদেবের হাত ধরে বিশ্বভারতীর জন্ম ২৩ শে ডিসেম্বর ১৯২১ আর তার তিরিশ বছর পরে তাঁর স্বপ্ন কে এগিয়ে নিয়ে যাবার প্রচেষ্টায় পন্ডিত নেহরু আর জাতির জনক গান্ধীজির ইচ্ছায় এটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয় গুরুদেবের মৃত্যু ১৯৪১ সালে প্রথম কুড়ি বছর গুরুদেব স্বহস্তে পরিচালনা করেছেন বিশ্বভারতীর কর্মকান্ড ১৯৪১ থেকে ১৯৫১ এই দশ বছরের ইতিহাস পাইনি তাই আমার জানা নেই যার মধ্যেই ভারতবর্ষ স্বাধীনতা অর্জন করে ধরে নিচ্ছি রথী দাদু তৎকালীন যাঁরা ছিলেন তাঁরাই তাঁদের মতন করে বিদ্যালয় পরিচালনা করেছিলেন তথ্য বলে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে ঘোষিত হওয়ার পর রথী দাদু প্রথম উপাচার্য্য তাহলে এটি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হওয়ার সম্মতি টি কার শুনেছি গুরুদেব তাঁর জীবৎকালে এই সম্মতি প্রদান করেছিলেন ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় ১৯৫১ থেকে রথী দাদু ১৯৫৩ অবধি এবং তারপর ১৯৫৯ অবধি একাধিক উপাচার্য্য এক বছর করে এই দায়িত্ব পালন করেছেন যেমন ক্ষিতি মোহন সেন , প্রবোধ কুমার বাগচী , ইন্দিরা দেবী চৌধুরানী , সত্যেন্দ্র নাথ বসু , ক্ষিতীশ চন্দ্র চৌধুরী এঁরা সকলেই একপ্রকার অস্থায়ী উপাচার্য্য হিসেবে কাজ করেছেন ১৯৫৯ সালে আসেন সুধী দাদু ( সুধীরঞ্জন দাস ) যিনি ১৯৬৫ অবধি দায়িত্ব পালন করেছেন যা আমাদের শৈশবের অন্তর্গত অর্থাৎ কেন্দ্রীয় বিদ্যালয় ঘোষিত হবার পরের দশ বছর বিশ্বভারতীর কর্ণধার হিসেবে নির্দিষ্ট কেউ ছিলেন না তাহলে গন্ডগোলের সূত্রপাত কি তখন থেকে ? নির্দিষ্ট ভাবনা রূপরেখা নিয়ে বিশ্বভারতী পরিচালিত হয়েছিল কি ? প্রশ্ন রয়েই যায় গুরুদেবের ভাবনা স্বপ্ন কে বাস্তবায়িত করার জন্য উপযুক্ত ছিলেন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর কিন্তু তাঁকে সরে যেতে হয়েছিল আর বিশ্বভারতীর কফিন বন্দি হওয়ার ইতিহাস বোধহয় সেদিন থেকেই লেখা শুরু হয়েছিল সেই ট্র্যাডিশন কি আজও চলছে ? সুধী দাদুর পরে একের পর এক  দিকপাল শিক্ষাবিদ রা এসেছেন  উপাচার্য্য হিসেবে কালিদাস ভট্টাচার্য্য , প্রতুল গুপ্ত , সুরজিৎ সিনহা , অম্লান দত্ত , সব্যসাচী বাবু প্রমুখ বিশ্ব ভারতী আর দশ টি বিদ্যালয়ের মতন নয় এর একটি সাংস্কৃতিক দিক আছে , একটি সামাজিক দিক আছে শিক্ষাচর্চার পাশাপাশি তার সঙ্গে প্রয়োজন একজন শক্ত , দক্ষ প্রশাসক এই এতগুলি দায়িত্ব  একজন উপাচার্য্যর পক্ষে মেটানো একপ্রকার অসম্ভব আমরা যাঁদের পেয়েছি তাঁরা প্রশাসনিক দিক থেকে কতটা কার্য্যকারী হয়েছিলেন সেই প্রশ্ন রয়ে যায় ফলে প্রশাসনিক অবক্ষয় দীর্ঘ দিন ধরে ভিতরে ভিতরে ঘুন ধরাচ্ছিলো আজ যা চরম সংকটের বাতাবরণ তৈরি করেছে  বিদ্যালয়ের ভাগ্য নিয়ে গুরুদেব নিজেও যে দোলাচলে ছিলেন তা বোঝা যায় তিঁনি খুঁজছিলেন এমন একজন কাউকে যিনি তাঁর অনুপস্থিতিতে এই বিদ্যালয়ের হাল ধরতে পারেন ১৯১৯ সালে জাপানে তাঁর দেখা হয় মীরা আলফাসা ও পল রিচার্ডের সঙ্গে   মীরা আলফাসা তখন জাপানে কাজ করছিলেন তাঁর কাজ ও ব্যবস্থাপনার গুন দেখে গুরুদেব মুগ্ধ হন ও শান্তিনিকেতনের দায়িত্বভার গ্রহণ করতে আমন্ত্রণ জানান মীরা জানতেন তাঁর ভবিষ্যৎ গন্তব্য ভারতবর্ষ কিন্তু শান্তিনিকেতন নয় এই মীরা আলফাসা পরবর্তীতে শ্রী অরবিন্দ আশ্রম , পন্ডিচেরী তে সাধিকা হয়ে আসেন ও শ্রীমা বলে পরিচিত হন ১৯৭২ সালে তৎকালীন প্ৰধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী শ্রীমা কে একই প্রস্তাব দেন আশ্রম স্কুল টি কে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিনত করতে কিন্তু শ্রীমা রাজি হননি যাঁরা পন্ডিচেরী গেছেন তাঁরা জানেন এই ছোট্ট আশ্রম তার শিক্ষাঙ্গন ও অন্যান্য বিভাগ নিয়ে সম্পুর্ন স্বয়ংসম্পূর্ণ  বিশ্বভারতীর থেকে অনেক সুচারু ও সুপরিকল্পিতভাবে চলছে   দ্বন্দ টি এখন এসে দাঁড়িয়েছে শান্তিনিকেতন কার ? রবীন্দ্রনাথের শান্তিনিকেতন টি আপেক্ষিক মূলতঃ এটি কেন্দ্র শাসিত একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান আমি কেন্দ্র কে কোন অবস্থাতেই দোষারোপ করছি না কেন্দ্রের আর দশ টি বিদ্যালয়ের মতন বিশ্বভারতী কেও একটি ধারায় উপনীত হতে হবে  বাস্তব হলো সেই ধারা আর গুরুদেবের ধারা সম্পূর্ন বিপরীতমুখী , এই দায় কার ? গুরুদেবের আশ্রম যে আর তাঁর মতন থাকবে না তা বোধহয় গুরুদেব জীবদ্দশায় বুঝে গেছেন এখন এই পরিবর্তিত ভারতবর্ষের মাটিতে দাঁড়িয়ে সরকারের ভরণ পোষণে বিশ্বভারতী কে যদি তপবোন আখ্যা দিতে হয় তা বড্ড বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে সবাই বলবে যা হবার তা তো হয়েই গেছে বিশ্বভারতী আজ কেন্দ্রের সম্পদ তাহলে কি করা যায় বিশ্বভারতীর প্রাণসত্তা টুকু বাঁচিয়ে রাখার দায়িত্ব তার প্রাক্তন দের হাতে আসুন আমরা প্রাক্তন রা বিশ্বভারতীর কতৃপক্ষের কাছে হাত বাড়াই টাকা পয়সা দিয়ে নয় নিজের ব্যক্তিগত সমযের বাইরে কিছু সময় আমাদের এই ভালোবাসার বিদ্যালয় কে কিছু voluntary service দিই আমাদের প্রকৃত সদিচ্ছা বাস্তবায়িত হোক কতৃপক্ষ যা বলবেন , যাকে যেখানে যে কাজ দেবেন আমি করতে রাজি আছি যে শিক্ষা আমি এই বিদ্যালয় থেকে অর্জন করেছি তা আজ অভিজ্ঞতার মাটিতে যে জ্ঞানের ফসল ফলিয়েছে তার সবটাই আমার বিদ্যালয় কে ফিরিয়ে দেওয়ার ইচ্ছা পোষণ করি যা পেয়েছি তা তো একদিন ফিরিয়ে দেবার সময় আসবেই আর তাতেই আসবে পূর্ণতা গুরুদেব বহু আগে প্রাক্তন দের এই দায়িত্ব দিয়েছিলেন আজ বোধহয় সেই সময় এসেছে কোনো বিরোধ নিয়ে নয় ভালোবাসার প্রতিদানে নিজেকে শান্তিনিকেতনের মূল স্রোতে আর একবার ভাসিয়ে দিয়ে তার আত্মার সঙ্গে সংযোজিত হই বাইরে থেকে সমালোচনায় কোনো বৃহৎ স্বার্থ সিদ্ধ হবেনা শুধু কথা চালাচালি আর বার্তালাপ হবে আপামর বাঙালি রবীন্দ্রনাথ কে ভালোবাসে কিন্তু সে তো তাঁর শিল্পকর্ম কে তাঁর গান , তাঁর লেখা , তাঁর ছবি তিঁনি দিয়েই গেছেন আমরা নিয়েই গেছি   মানুষ রবীন্দ্রনাথ কে ভালোবাসে কয়জন ? যে মানুষ টি এই বিদ্যালয়ের জন্য সাগর পাড়ি দিয়েছেন ভগ্ন শরীরে অর্থ সংগ্রহ করতে , যে প্রতিষ্ঠান একটি সমান্তরাল শিক্ষা ব্যবস্থার জন্ম দিয়েছিল তার প্রতি আমাদের দায়বদ্ধতা আরও আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন আপেক্ষিক নয় আমরা তাঁকে ভুলতে পারিনা আমাদের মধ্যে দিয়ে তাঁর ইচ্ছা ও ভাবনা টুকু বেঁচে থাক না

মন্তব্যসমূহ